বিতর্কিত মন্ত্রী-এমপিরা মনোনয়ন পাবেন না

0
75

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না বিতর্কিত মন্ত্রী-এমপিরা। এ তালিকায় কপাল পুড়ছে বর্তমান সংসদে থাকা শতাধিক এমপির। যেসব এমপির এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা নেই, যারা তৃণমূল নেতা-কর্মীদের দ্বিধাবিভক্ত করেছেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, তাদের নৌকায় তুলবেন না আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

দলের উচ্চপর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, মন্ত্রী-এমপি মিলিয়ে শ’খানেক আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তারা নানা কারণে দলে ও এলাকায় বিতর্কিত হয়েছেন। একাধিক সংস্থা এবং বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে মূলত একটি সারসংক্ষেপ প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। বিএনপির অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জিং ধরে নিয়ে ‘জনবিচ্ছিন্ন’, ‘গডফাদার’ ও ‘বিতর্কিত’ এমপি-মন্ত্রীদের প্রতি দলীয় প্রধানের কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। দলকে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আনতে দৃঢ় অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে তৃণমূলে ‘জনপ্রিয়’ ও ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তির’ প্রার্থী চূড়ান্ত করতে চান তিনি। যাতে ভোটের লড়াইয়ে জয় নিয়ে ঘরে ফেরা যায়। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন  হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেবে। সে কারণে হিসাব-নিকাশ করে এই নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিতে হবে। স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও এলাকায় গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে ভোটের আগেই এগিয়ে থাকতে চায় ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা। এক্ষেত্রে নেতা-কর্মীদের কাছে ভালো ইমেজ, সংগঠক হিসেবে দক্ষ, সততা, নিষ্ঠা ও শিক্ষিত, এমন যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন। ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপির প্রার্থীর ওপরও নির্ভর করবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবন সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দেড় বছর বাকি থাকলেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন থেকেই হোমওয়ার্ক শুরু করে দিয়েছেন। বর্তমানে মন্ত্রী-এমপিদের আমলনামা সংগ্রহ ছাড়াও তিনি সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, কে বাদ পড়বেন— এটিও যেমন দেখছেন, তেমনি চলমান সংসদের যেসব এমপির নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে আগামী নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়টিও তিনি পর্যালোচনা করছেন। কয়েকটি সংস্থা ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতি তিন মাস পর পর মাঠে জরিপগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে শতাধিক বর্তমান এমপির ব্যাপারে নেতিবাচক রিপোর্ট এসেছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। কারও বিরুদ্ধে এলাকায় গডফাদার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনী এলাকার জনগণের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। সংসদীয় আসনে গ্রুপিং করে নেতা-কর্মীদের তারা বিভক্ত করে রেখেছেন। আওয়ামী লীগ বনাম এমপি লীগ তৈরি করেছেন। দলীয় নেতা-কর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে তাদের চরম নেতিবাচক ইমেজ। কেউ কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর কালেভদ্রে দুই গাড়ি পুলিশ নিয়ে এলাকায় যান। আবার সরকারি কর্মসূচি শেষ করেই ঢাকায় চলে আসেন। দলের নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে তারা আত্মীয়স্বজনদের বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অনেক এমপি স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, মেয়ে জামাই, ভাই, শ্যালক, ভাতিজা, ভাগ্নেসহ নিকটাত্মীয়দের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। দলের নিজ গ্রুপিং ভারি করতে বিএনপি-জামায়াত-শিবির আওয়ামী লীগে ভিড়িয়েছেন। এমপি-মন্ত্রীদের হাত ধরে দলে যোগ দিয়েই ‘হঠাৎ লীগ’ হয়ে এলাকায় বেপরোয়া আচরণ করছেন। এসব হঠাৎ লীগের নেতাদেরই বিভিন্ন ঠিকাদারি, বালুমহাল, হাটবাজার নিয়ন্ত্রণসহ টেন্ডারবাজিতে যুক্ত করেছেন এমপি-মন্ত্রীরা। দলের নেতা-কর্মীরা এমপির সাক্ষাৎ পান না। আবার কেউ কেউ দলের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকেও চাকরি দেওয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু চাকরি দেননি। অনেক এমপি এলাকায় খুন-সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এমপিদের বিরুদ্ধে যে-ই কথা বলছেন, তাদের কাউকে পঙ্গুত্ববরণ ও অথবা জীবন দিতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই হামলা-মামলায় ঘরছাড়া। যেন তারা বিরোধী দলে। এসব এমপির ত্রাসের রাজত্বে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। বর্তমান মেয়াদের এমপি কেউ কেউ হত্যা, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছেন। আবার কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক তদন্ত শুরু করেছে। এসব গুরুতর অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে এসেছে, তাদের কাউকে কাউকে ডেকে সতর্ক করছেন দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আবার দলের সাধারণ সম্পাদককে দিয়েও সংশোধন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জনবিচ্ছিন্ন’, ‘গডফাদার’ ও ‘বিতর্কিত’ এমপি-মন্ত্রীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা বর্তমানে এমপি আছেন, তারা নিশ্চিত মনোনয়ন পাবেন— এমন ধারণা নিয়ে থাকলে ভুল করবেন। কারণ আগামী নির্বাচন ২০১৪ সালের মতো হবে না। যারা এলাকার জনগণের জন্য কাজ করেছেন, জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। আমি কারও দায়িত্ব নেব না। নিজ দায়িত্বে জয়লাভ করে আসতে হবে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের জন্য চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। খুব ভালোভাবে মনিটরিং করছি। পর্যবেক্ষণ ও জরিপ করে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, যারা জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য, যারা ‘গডফাদার’ চরিত্রের তাদের আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।

Facebook Comments