নড়াইলে ১০ বছরে বোরো আবাদে সেচ খরচ বেড়েছে দ্বিগুনেরও বেশি

0
220

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি: নড়াইল( রবিবার ২৮ মে ) এক কেজি বোরো ধান উৎপাদন করতে পানি প্রয়োজন ৩ হাজার থেকে ৪৮শ লিটার ইতোমধ্যে পানির অভাবে সাড়ে ৪ হাজার হেক্টোর জমি অনাবাদি হয়েছে।

আগামি ১০ বছরে আরও অন্তত ৫ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি হওয়ার আশংকা করছে কৃষকেরা। দিন যাচ্ছে আর কৃষকের বোরো আবাদে বিভিন্ন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১০ বছরে নড়াইলে বোরো আবাদে শুধু সেচ খরচ বেড়েছে দ্বিগুনেরও বেশি। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে পানির অভাবে বোরো আবাদ করতে পারছেনা কৃষকেরা। এভাবে চলতে থাকলে আগামি ১০ বছরে আরও অন্তত ৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করতে পারবেনা বলে কৃষকদের অভিযোগ। তেল (ডিজেল) ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারনে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অস্বাভাবিক হারে সেচ খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কৃষকদের অভিযোগ। এছাড়া প্রাকৃতিক উৎস (নদী ও খাল) থেকে পানি ব্যাবহার করতে না পেরে সেচ মেশিনের উপর নির্ভর হয়ে পড়ায় খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কৃষকেরা জানান। জানা গেছে, ১০ বছর পূর্বে এক লিটার ডিজেলের দাম ছিল ৫২ থেকে ৫৬ টাকা বর্তমানে সেই দাম বৃদ্ধি পেয়ে ৬৮ থেকে ৭০ টাকা হয়েছে। দশ বছর পূর্বে বিদ্যুত এর ইউনিট ছিল ২ টাকা ৫০ পয়সা বর্তমানে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৪টাকা ৫০ পয়সায়।

কৃষকেরা জানান, কয়েক বছর পূর্বের তুলনার বর্তমানে সেচ মেশিনে পানি উঠেনা। এক লিটার ডিজেল ব্যবহার করে আগে ৫০ থেকে ৫৫ মিনিট মেশিন (সেচ পাম্প) চালানো যেত এবং মেশিন দিয়ে অনেক পানি উত্তোলন করা যেত। বর্তমানে এক লিটার ডিজেল দিয়ে ৩০ মিনিটের বেশি সময় সেচ পাম্প চালানো যায়না। পানিও কম উঠে। এতে তাদের সেচ খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

প্রতি বছরই জেলায় পর্যাপ্ত পরিমান বোরো আবাদ হয়। আর এই চলতি মৌসুমে জেলায় ৪১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয় । আর এতে ধান উৎপাদন হয়েছে ২ লক্ষ ৬১ হাজার ২৪৮ মেট্রিক টন। মাত্র এক কেজি বোরো ধান উৎপাদন করতে ৩হাজার থেকে ৪হাজার ৮শ লিটার পর্যন্ত পানির প্রয়োজন হয়। আর এই সব পানির অন্তত ৯৫ ভাগ পানি আসে মাটির নিচ থেকে। প্রতি বছর এই বিশাল পরিমান পানি মাটির নিচ থেকে উত্তোলন করায় দিন দিন পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। সে কারনে সেচ মেশিনে আগের মত পর্যাপ্ত পানি উঠছেনা। ফলে কৃষকদের বোরো উৎপাদনে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, প্রভাবশালীদের কারনে প্রান্তিক কৃষকেরা খাল বিলসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয় থেকে পানি নিতে না পারায়, ডিজেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায়, কৃষকদের দ্বন্দ্বের কারনে ঘন ঘন সেচ মেশিন স্থাপন করায়, সংশ্লিষ্ট উপজেলা সেচ কমিটির কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে অপরিকল্পিতভাবে সেচ মেশিন স্থাপন করায়, বিভিন্ন নদী ও খালে জোয়ার ভাটা হ্রাস ইত্যাদি কারনে কৃষকেরা নদী ও খাল থেকে পানি তুলতে না পেরে বাধ্য হয়ে ভুগর্ভস্থ থেকে পানি তুলছে। এতে কৃষকদের সেচ খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, ১০ বছর পূর্বে এক একর জমিতে বোরো উৎপাদন করতে সেচ খরচ হত ৩ হাজার ৫শ টাকা। বর্তমানে এক একর জমিতে সেই খরচ বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছে ৭ হাজার ৫শ টাকায়। ১০ বছর পূর্বে জেলায় মোট সেচ মেশিন ছিল ১১ হাজার বর্তমানে মেশিনের সংখ্য বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছে ১৬ হাজার ৫শ ৯৮ টি। একটি সেচ মেশিনে যদি ২ শত ফুট পাইপ থাকে তাহলে আরেকটি সেচ মেশিনের দূরত্ব কমপক্ষে ৪ শত ফুট হতে হবে। অথচ কৃষকেরা তাদের দ্বন্দ্বের কারনে এই নিয়ম না মেনে যত্রতত্র সেচ মেশিন স্থাপন করছে। ফলে মেশিনগুলো থেকে ঠিকমতো পানি উঠছেনা। প্রতিটি উপজেলায় সেচ কমিটি থাকলেও শতকারা ৯৯ ভাগ কৃষকই সেচ কমিটির কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে মেশিন স্থাপন করছে। অথচ আইন আনুযায়ী প্রতিটি সেচ মেশিন স্থাপন করার পূর্বে সংশ্লিষ্ঠ উপজেলা সেচ কমিটির কাছ থেকে অনুমতি পত্র নিয়ে মেশিন স্থাপন করতে হবে।

বিভিন্ন সুত্রে জানাগেছে, দশ থেকে বার বছর পূর্বে থেকে নড়াইল সদর উপজেলা ও লোহাগড়া উপজেলার কয়েকটি বিলে পানির সংকট দেখা দেয়। দিন দিন এই পানির সংকট তীব্র আকার ধারন করছে। এবং এর (এলাকার) পরিধিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে সদর উপজেলার মাইজপাড়া, হবখালি, শাহবাদ, চন্ডিবরামপুর, কলোড়া, বিছালী ইউনিয়ন এবং লোহাগড়া উপজেলার নলদী, লাহুড়িয়া, জয়পুর ও শালনগর ইউনিয়নে প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত খাবার পানি সংকট দেখা দেয়। ইতোমধ্যে এসব এলাকায় বোরো আবাদ থেকে অনাবাদি হয়েছে অনেক জমি। এইসব এলাকায় সাধারন্ত পানির স্থিতিতল (ডধঃবৎ ঞধনষব) ২৫ ফুটের নিচে থাকলে সাভাবিক ভাবে পানি উত্তোলন করা যায়। কিন্ত বোরো মৌশুমে ( ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত) এসকল এলাকায় পানির স্থিতিতল ৩৫ ফুটের নিচে চলে যায়। যে সব এলাকায় পানির স্থিতিতল ৩৫ ফুটের নিচে চলে যায় সেই সব এলাকায় সেচ মেশিনে পানি উঠেনা। প্রতি বছর পানির স্থিতিতল ক্রমাগত নিচে নামছে।

প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, জলবায়ুর পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারনে এলাকায় শুস্ক মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সদর ও লোহাগড়া উপজেলায় পানি সংকট দেখা দেয়। এতে মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি হয়, ব্যাহত হয় সেচ নির্ভর কৃষি আবাদ। প্রতি বছরই এই পানির সংকট মারাক্তক আকার ধারন করছে।
সরেজমিনে নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা গিয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সদর উপজেলার মাইজপাড়া, হবখালি, শাহবাদ, চন্ডিবরামপুর, কলোড়া, বিছালী ইউনিয়ন এবং লোহাগড়া উপজেলার নলদী, লাহুড়িয়া, জয়পুর ও শালনগর ইউনিয়নে বিভিন্ন বিলে বোরো মৌশুমে পানির তিব্র আকার ধারন করে। এসময় বেশির ভাগ সেচ মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে। যে সকল মেশিনে পানি উঠে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুব সামান্য। অনেক কৃষক এসময় ৮-১২ ফুট মাটি গর্ত খুড়ে মাটির নিচে সেচ মেশিন স্থাপন করে পানি তোলার চেষ্টা করে। এতে মেশিনে সামান্য পরিমান পানি উঠলেও কৃষকদের তেল খরচ অনেক বৃদ্ধি পায়। ফলে এসব এলাকার অনেক জমিতে বোরো উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকেরা। কৃষকদের আশংকা এভাবে চলতে থাকলে আগামি ১০ বছরে এলাকার অন্তত ৫০ ভাগ জমিতে তারা পানির অভাবে বোরো চাষ করতে পারবেনা।

বিশেষ করে জেলার হবখালি,পাজারখালি, বিলডুমুরতলা, রাজাপুর, বাতাসী, শালনগর, মাকড়াইল, কল্যাণপুর, হেচলাগাতি, ঝামারঘোপ, সায়মানার চর,পঁচাশিপাড়া, ডহরপাড়া গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী অনেক গ্রামের বিলে পানির অভাব তীব্র আকার ধারন করে।

নড়াইল সদরের হবখালি ইউনিয়নের পাজারখালী গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, তিনি ১৬ বছর যাবৎ বোরো আবাদ করেন। ১০ বছর পূর্বে তিনি ৩ একর জমিতে বোরো আবাদ করতেন । গত ৫ বছর যাবৎ তিনি ২ একর ৩০ শতক জমিতে বোরো আবাদ করেন। বাকি ৭০ শতক জমিতে পানির অভাবে বোরো আবাদ করতে পারেননা। ঐ জমিতে সেচ মেশিনেও পানি উঠেনা। বাধ্য হয়ে তিনি তার জমিতে অন্য ফসল আবাদ করেন। বর্তমানে তিনি প্রতি বছর যে জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেন সেই জমিতে এক দিন পর একদিন অর্থাৎ মাসে ১৫ দিন সেচ দেওয়া লাগে বলে তিনি জানান। এতে তার জমিতে বোরো আবাদে খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তার অভিযোগ।

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার নলদি গ্রামের কৃষক সেলিম শেখ জানান, বোরো ধানে আগে ৩ থেকে ৪দিন পরপর সেচ দিতে হত। বর্তমানে বোরো মৌশুমে তার জমিতে ১দিন পর ১দিন সেচ দেওয়া লাগে। এই জন্য বোরো উৎপাদনে সেচ খরচ অনেক বেশি হয়। তিনি আরও জানান, আগে তারা খাল থেকে পানি নিয়ে বোরো আবাদ করতেন। খরচও অনেক কম হত। বর্তমানে তাদের খালে জোয়ার-ভাটা নেই। আগের মত পানিও পাওয়া যায়না। যে স্বল্প পরিমান পানি থাকে সেই পানি প্রভাবশালীদের কারনে তারা ব্যাবহার করতে পারেনা। ফলে বাধ্য হয়ে নিজ জমিতে সেচ মেশিন স্থাপন করে বোরো আবাদ করেন তিনি। এতে খরচ বেশি হলেও কিছুই করার নেউ বলে জানান তিনি।

লোহাগড়া উপজেলার নলদী গ্রামের প্রান্তিক কৃষক কাজী বাছাক জানান, পানি সমস্যার কারনে তিনি প্রায় ২ একর জমিতে বোরো চাষ করতে পারেননা। অথচ এই জমিতে তিনি ৬-৭ বছর আগেও বোরো আবাদ করেছেন। সরকারের কাছে তার দাবী এলাকায় ইরিগেশনের মাধ্যমে নদী থেকে পানি উত্তোলন করে কৃষকদের মাঝে পানি সরবরাহ করা হোক।

কৃষকদের নিয়ে কাজ করা এনজিও (উজিরপুর অরগানিক সমিতির) নির্বাহী পরিচালক মোঃ শান্ত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারনে সারাদেশের ন্যায় নড়াইলেও পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। কয়েক বছর যাবৎ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। ফলে অনেক এলাকায় কৃষকেরা বোরো আবাদ করতে হিসসিম খাচ্ছে। অনেক জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। যে সকল জমিতে বোরো আবাদ করছে তাতে সেচ খরচ আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকেরা আগামিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে । অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়বে। কৃষকদের মাঝে দ্বন্দ্ব কমাতে হবে। ঘন ঘন সেচ মেশিন স্থাপন না করে প্রযুক্তি পরিবর্তন করে এলাকাতে সেচ মেশিন স্থাপন করলে পানির সমস্যা কিছুটা কম হবে এতে কৃষকেরা উপকৃত হবে বলে মনে করেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর এর উপ-পরিচালক শেখ আমিনুল হক জানান, বোরো মৌশুমে নড়াইল জেলায় কিছু কিছু এলাকায় পানির সমস্যা দেখা দেয়। বোরো উৎপাদন করতে অনেক বেশি পানির প্রয়োজন হয়। এসব এলাকার কৃষকদের দিকে বিবেচনা করে আমরা তাদেরকে বোরো উৎপাদন থেকে বিরত থেকে যে সব ফসল উৎপাদন করতে পানি কম লাগে সেই সব ফসল উৎপাদন করতে পরামর্শ দিয়ে থাকি। তিনি আরও বলেন, বোরো উৎপাদনে খরচ বৃদ্ধি পেলেও ধানের দামও সরকার বৃদ্ধি করেছে।

Facebook Comments