“হর্ন হুদাই বাজায় ভোদাই”

0
354

সৈয়দ অদিতঃ বেলা ১০টা। রাজধানীর শাহবাগ এলাকা তখন ভীষণ ব্যস্ত। চারদিক থেকেই গাড়ির দীর্ঘ সারি। একটি আরেকটিকে অতিক্রমের চেষ্টায় মরিয়া গাড়িগুলো ক্রমাগত বাজিয়ে চলেছে হর্ন। অথচ এই মোড়ের দুই পাশে দুটি বড় হাসপাতাল। একটি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল, অপরটি বারডেম। জটিল রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছে সেখানে। উচ্চ শব্দে ভীষণ সমস্যা হয় তাদের। এই এলাকায় হর্ন বাজানোও নিষেধ। কিন্তু হাসপাতালের ভেতরের রোগীদের সমস্যা নিয়ে বাইরের গাড়িচালকদের কোনো ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।

কাছাকাছি সময়ে মহাখালীর পরিস্থিতিও মোটামুটি একই দেখা গেলো। তিন দিক থেকে চলা গাড়িগুলোর একটি অংশই একই সময়ে হর্ন বাজিয়ে চলার কারণে ওই মোড়ে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছিল। অথচ নয় বছর আগে ওই সড়কে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু কে বলবে এখনও কার্যকর আছে সে নিষেধাজ্ঞা?

পরের চিত্রটি রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায়। এখানেও রয়েছে দুইটি বড় হাসপাতাল ল্যাবএইড ও পপুলার। সেখানেও একই অবস্থা যানবাহনের হর্নের আওয়াজে ওই এলাকার মানুষ।

মানুষের বিরক্তি প্রকাশ্য, কিন্তু কাকে বলবে মানুষ?

সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় কথা হলো ৬০ ঊর্ধ্ব রহিম মিয়ার সঙ্গে। তিনি ওই এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট একটি মুদির দোকান চালান। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘বেশি শব্দ আমার সয় না। কান আমার নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তার কইছে শব্দের লাইগ্যা এই অবস্থা আমার। এহন কানে শুনি না। ডাক্তার কানে মেশিন লাগাইছে।’

রহিম মিয়া জানালেন, সাধারণ কথা শুনতে কষ্ট হলেও এই সড়কের তীব্র শব্দ তাকে এখনও কষ্ট দেয়। বলেন, ‘গাড়ি হরেন বাজায় কতায় কতায়। জোরে শব্দ করে অন্য গাড়িও।’

রহিম মিয়ার এই বিড়ম্বনা রাজধানীতে কমবেশি সবার। অকারণে হর্নের ব্যবহার, গাড়ির ইঞ্জিন ঠিকমত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় অতিরিক্ত শব্দ, উচ্চ শব্দের মাইক আর নির্মাণ যন্ত্রের ব্যবহারের কারণে রাজধানীর নিরাপদ শব্দসীমা অতিক্রম করে গেছে আগেই। এ বিপদ অনেক হলেও বিষয়টি নগর কর্তৃপক্ষের নজরে আসছে না।

নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ আর পরিবেশবিদরা বলছেন, অতিরিক্ত শব্দের কারণে রাজধানীর একটি বড় অংশের মানুষেরই কানে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে। সরকার এখনই উদ্যোগী না হলে বা মানুষের মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতা তৈরি না হলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও খারাপের দিকে যাবে।

প্রবণতা বেশি মোটরসাইকেল আর প্রাইভেটকার চালকদের মধ্যে

সড়কে দেখা গেছে, হর্ন বাজানোর প্রবণতা বেশি মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে। এরপরই আছে প্রাইভেটকার চালকরা। যত শব্দসীমায় হর্ন বাজানো যায়, অনেক গাড়ির হর্নের শব্দই তার চেয়ে বেশি। অনেকে আবার হর্নের পাশাপাশি উচ্চ শব্দ করে এমন যন্ত্রও লাগায় তাদের যানবাহনে। কেউ কেউ আবার সাইলেন্সার ইচ্ছে করে কষ্ট করে দেয়। ফলে গাড়িগুলো কোনো এলাকা দিয়ে গেলে বহু দূর থেকেও এর শব্দ পাওয়া যায়।

রাজধানীতে গাড়িচালকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যানজটে আটকে থেকে সামনের গাড়িতে চলার তাগাদা দিতেই হর্ন বাজায়। প্রতিটি গাড়িতেই সামনের গাড়িকে সংকেত দিতে বিশেষ ধরনের বাতি থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার করেন না চালকদের একটি বড় অংশই।

নির্দেশনা জারী করে ভুলে গেছে পুলিশ

২০০৭ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশ রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক, মিরপুর রোড, গুলশান, ধানমন্ডি এলাকাসহ বেশ কিছু সড়কে হর্ন বাজানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছিল। এই আদেশ হওয়ার পর কয়েকদিন অভিযানে জরিমানা করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও দিতো বাহিনীটি। কিন্তু এখন বন্ধ হয়ে গেছে সব অভিযান। আসলে এখনকার পুলিশ কর্মকর্তারা সেই আদেশের কথা মনেই করতে পারছেন না।

পুলিশ কেন নিজের জারি করা আদেশ ভুলে গেছে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের হাতিরঝিল অঞ্চলের সহকারী কমিশনার আবু ইউসুফ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘তখন কী হয়েছিল তা আমি জানি না। এটা আমাদের সিনিয়র স্যাররা বলতে পারবেন।’

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহউদ্দিন আহমেদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘কোন কোন রাস্তায় এই নির্দেশনা দেওয়া আছে তা আমার জানা নেই। তবে যদি সিটি করপোরেশন কোনো রাস্তায় সাইনবোর্ড লাগিয়ে হর্নবাজানো নিষেধ করে, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেই।’

পরিবেশ দিবস আসলেই মাঝেমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর হর্ন না বাজানোর অনুরোধ করে পোস্টার লিফলেট বিতরণ করলেও দিবসটি পেরিয়ে গেলে সচেতনতা বাড়াতে তেমন কোনা চেষ্টাই চোখে পড়ে না। অথচ অধিদপ্তরের প্রচারপত্রই বলছে হর্নের অতি ব্যবহারে শুধু শ্রবণশক্তিই নয়, উচ্চরক্তচাপ, মাথাধরা, পেটিক আলসার, ফুসফুসের প্রদাহসহ নানা রকমের মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, যানবাহনের শব্দ দূষণ স্টোকের ঝুঁকিও বাড়ায়। এমনকি মানুষের মৃত্যুও হতে পারে।

এক হর্ন যদি এত ক্ষতি করে তাহলে এর বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎপরতা নেই কেন-জানতে চাইলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনোয়ার হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে বৈঠকে অনেক সিদ্ধান্তই হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না।’

এই পরিবেশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ঢাকায় যানবাহন বেশি আর এ কারণে যানজট বাধে। তাই মানুষ অধৈর্য্য হয়ে আগে যাওয়ার চেষ্টায় হর্ন বাজায়। এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব আছে। এই সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ করে সরকারি বিটিভিতে আমরা নানা বক্তব্য প্রচার করছি।’

গবেষণার ফল ভীতি জাগানিয়া

শব্দদূষণ নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সর্বোচ্চ শব্দসীমা ৫৫ ডেসিবেল। নীরব এলাকার জন্য এই শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকার জন্য সর্বোচ্চ শব্দসীমা ৭৫ ও ৭০ ডেসিবেল।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডবিস্নউএইচও) বলছে, ৬০ ডেসিবেল শব্দ মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট করতে পারে। আর ১০০ ডেসিবেল শব্দ চিরতরে মানুষের শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দিতে পারে। এই হিসাবে রাজধানীতে শব্দদূষণ মানুষকে বধিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জরিপে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে ১০২ ডেসিবেল। একইভাবে মতিঝিলে  ৯৩, বাংলামোটরে ৯২, সদরঘাটে ৮৮, ফার্মগেটে ৯৩, শাহবাগে ৮৬, মহাখালীতে ৯৪, ধানমণ্ডিতে ১০১, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে ৯৫ ডেসিবল।

পরিবশে বাঁচাও আন্দোলনের মতে, ৩০টি কঠিন রোগের মধ্যে ১২টি পরিবেশ দূষণের ফলে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল ঢাকাটাইমসকে জানান, মানুষ এখনো উপলব্ধি করতে পারছেনা যে তাদের কী পরিমাণ ক্ষতি সৃষ্টি হচ্ছে। সবার আগে প্রয়োজন আত্মসচেতনতা বোধ সৃষ্টি। মানুষের মাঝে যদি আত্মসচেতনা বোধ সৃষ্টি না হয় তাহলে শব্দ দূষণ কমানো অসম্ভব।

বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিব মেডিকেল হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিষেষজ্ঞ রাজু বড়ুয়া ঢাকাটাইমসকে জানান, ‘তীব্র শব্দে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু এবং বয়স্ক মানুষ। উচ্চশব্দে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হঠাৎ বিকট আওয়াজ মানুষের কানের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর।’

বিকল্প থাকলেও সচেতনতা কম

কেউ কেউ অবশ্য সচেতনভাবে হর্ন এড়িয়ে চলেন। এদের একজন আল ফারুক। মোটর সাইকেল চালান তিনি ১০ বছর ধরে। একান্ত বাধ্য না হলে তিনি হর্নের ব্যবহার করেন না। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘সংকেত বাতি ব্যবহার করি আমি। হর্ন ব্যবহার না করায় আমাকে আজ পর্যন্ত কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি।’

অফিসে আসা যাওয়ার জন্য প্রতিদিনই ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার বাইক চালাতে হয় জনাব ফারুককে। তিনি বলেন, ‘আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে চালকরা হর্ন বাজায় এটি না বাজালে যে কোনো সমস্যা হয় না সেটা না জানায়। আমি ইন্ডিকেটর লাইট দিয়ে সামনের গাড়িকে সংকেত দেই। সেটা চালক দেখে না এমনটা আমার মনে হয়েছে কমই। কিন্তু যারা এই বিষয়ে সচেতন নয়, তারাই বেশি হর্ন বাজায় বলেই মনে হয়েছে আমার আছে।’

Facebook Comments