বুড়িগঙ্গা নদী এখন ডাস্টবিন : কারণ ও প্রতিকার

0
1563
পানিতে এন্টিবায়োটিকসহ হাসপাতালের বর্জ্য মিশছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা । ছবি ,মিথুন

মাহফুজ আল মুমিন(মিথুন): চারশ বছরের প্রাচীন নগর ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত।বর্তমানে বুড়িগঙ্গা ভয়াবহ দূষণের শিকার।দুই দশক ধরে প্রচার-প্রচারনা, আন্দলন এবং নানা প্রকার বাস্তবায়ন হলেও কিনচিৎ কমানো যায়নি বুড়িগঙ্গার দূষন ও দখল।এর জীব বৈচিত্র্য আজ ধ্বংসপ্রায়। হঠাৎ করে এ ঘটনা ঘটেনি। বিগত ত্রিশ চল্লিশ বছরের নগর জীবনের বিরূপ প্রভাবে দূষিত এ বুড়িগঙ্গা। বাষট্টি রকমের রাসায়নিক বর্জ্যে মিশে বিষাক্ত হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার পানি। বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নদীর তলদেশে জমাট বেঁধেছে ৮ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর। পানিতে এন্টিবায়োটিকসহ হাসপাতালের বর্জ্য মিশছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কারণ ও প্রতিকার :বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন অনেক কমে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে পানি। রাজধানী ঢাকার প্রাণরূপী বুড়িগঙ্গা এখন নগরবাসীর আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিন মাত্র।বুড়িগঙ্গা দূষিত হওয়ার মুখ্য কারণগুলো হলো।.মানুষের মলমূত্র বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিলিত হয়।.বিভিন্ন কাঁচাবাজারের এবং হাসপাতালের উচ্ছিষ্ট আবর্জনা সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলা হয়।.বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত বেশকিছু শিল্পকারখানার মোট ৬২ প্রকারের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি বুড়িগঙ্গায় পতিত হয়।.বুড়িগঙ্গার ওপারে অবস্থিত ডকইয়ার্ডে প্রায় সারা বছরই জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কাজ চলতে থাকে। সেখান থেকেও শিল্পজাত আবর্জনা নদীতে পতিত হয়।.নদীতে চলাচলকারী নৌযান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার পোড়া তেল ও মবিল নির্গত হচ্ছে যা বুড়িগঙ্গার পানিকে দূষিত করছে।

দূষণের মুখ্য উৎসগুলো বন্ধ করতে পারলে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো যেতে পারে। বিশ্বে এমন কোনো শহর খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে মানুষের মলমূত্র ওই শহর যে নদীর তীরে অবস্থিত সেখানে গিয়ে পড়ে, কিন্তু আমাদের দেশে তা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত টেক্সটাইল, ব্যাটারি, লোহা, রঙ, রাবার ,চামরা প্রভৃতি শিল্পকারখানা হতে নির্গত আবর্জনা বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগ হিসেবে সরাসরি নদীতে এসে মিশ্রিত হয়। কারখানার এরূপ বর্জ্য পদার্থে জলজ পরিবেশে বসবাসকারী জীব এবং মানুষের জন্য ক্ষতিকারক উপাদান যেমন পারদ, সিসা, ক্লোরিন, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, দস্তা, নানা রকম এসিড, ক্ষারক, আর্সেনিক, সায়ানাইড ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় উপস্থিত থাকে।

জলজ জীবদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য নির্দিষ্ট অমস্নত্ব বা ক্ষারকত্বের প্রয়োজন। কিন্তু শিল্পকারখানা নির্গত আবর্জনার উপাদান পানিতে এসে কখনো অম্লত্ব বা কখনো ক্ষারকত্ব বাড়িয়ে দেয়।এতে নদীর মাছের মৃত্যু হতে পারে। তাছাড়া বিভিন্ন দূষক পদার্থের প্রভাবে প্লাংটন ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী বিনষ্ট হলেও মাছেরা মৃত্যুমুখে পতিত হতে পারে (যেহেতু প্লাংটন মাছের খাবার)।ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে ট্যাবলেট ও ক্যাপসুলের খোলস, সিরিঞ্জ, ব্যান্ডেজ, সিরাপ প্রভৃতি বর্জ্য বের হচ্ছে যা সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলা হচ্ছে। আর

তাদের না ফেলেই বা উপায় কী। কারণ এগুলো রিসাইক্লিং করার মতো আধুনিক ডাম্পিং ব্যবস্থা নেই। এ সমস্ত বর্জ্যের মধ্যে মিশে আছে পেনিসিলিন, এমোক্সিসিলিন, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন প্রভৃতি উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক। সুতরাং বুড়িগঙ্গার পানিতে ভাসছে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যারা এই পানি ব্যবহার করছে তাদের সবার উপরই এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।

বুড়িগঙ্গা আজ ইউট্রোফিকেশন কবলিত। কাঁচাবাজারের উচ্ছিষ্ট পদার্থ এবং কলকারখানা থেকে নির্গত আবর্জনা সূত্মপীকরণ দ্বারা এ ইউট্রোফিকেশন ত্বরান্বিত হয়েছে। অর্থাৎ বুড়িগঙ্গার নিচে রয়েছে অদ্রবীভূত আবর্জনার বিশাল স্তূপ। প্রতিদিন দশ হাজার ঘনমিটারের বেশি বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়। এতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদীর তলদেশ। নদীর তলদেশে জমা হয়েছে ৮ ফুট পলিথিনের স্তর। নদীকে বাঁচাতে হলে এ আবর্জনার স্তর যে কোনো মূল্যে অপসারণ করতে হবে।

চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে বুড়িগঙ্গার তীরে ভ্রমণের জন্য আসত। প্রাণভরে সেবন করত নির্মল বায়ু। অনেকে নৌকা ভাড়া করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে বেড়াত নদীর বুকে। অনেকে আবার শখের বসে মাছও ধরত। এখন আর সে অবস্থা নেই। শৌখিন মৎস্য শিকারি তো দূরের কথা, পেশাদার জেলেরাও এখন আর সেখানে মাছ ধরে না। কারণ মাছের আকাল।এ পরিবেশে কোনো মাছ বা জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না।

যে কোনো নদীর জলের কতিপয় গুণমান থাকে। যেমন_ পানি বর্ণহীন, গন্ধহীন হতে হবে। কিন্তু বুড়িগঙ্গার পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত।দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ যারা লঞ্চে যাতায়াত করে, তারা তাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকা আসার পথে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ ঢুকলেই নাকে রুমাল ধরে। তবে বর্ষাকালে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। পানি অপেক্ষাকৃত সাদা দেখায় এবং দুর্গন্ধ কিছুটা হলেও কমে যায় কিন্তু এই অবস্তা বেশি দিন থাকে না র্বষা শেষ হতে না হতেই পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়।

Facebook Comments